*

দিগদর্শন ওয়েব ডেস্ক: গঙ্গা তীরবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ মীরপুর আজকের বজবজ মহেশতলা। মীর উপাধিপ্রাপ্ত কোনো মুঘল রাজ ব্যক্তিত্বের নামানুসারে এলাকার নামকরণ হয় মীরপুর। কোনো প্রভাবশালী হিন্দু জমিদারদের দেবত্ব মহাদেবের মন্দিরের সূত্র ধরে নামকরণ মহেশতলা। পরবর্তী সময়ে চেকব্যবসায়ীর দৌলতে গড়ে ওঠে বিশ্বখ্যাত বাটা কোম্পানির জুতোর কারখানা। বাটা নগর নামকরণ যেখান থেকে।
আগামী ২৩ আগস্ট দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাটা নগর ফুটবল ক্লাবে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে দশ হাজার কণ্ঠে গীতাপাঠ। অনুষ্ঠানটির আয়োজক সনাতনী সংস্কৃতি সংঘ। দশ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে এই গীতাপাঠ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় থাকছে মহেশতলা হ্যান্ডিক্যাপ্ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাটানগর মহেশতলা প্রক্ষণ্ড।
আয়োজক সংস্থার পক্ষে আহ্বায়ক সুমন ভট্টাচার্য জানালেন, সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা প্রয়োজন। আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন প্রধান অতিথি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মহেশতলা প্রক্ষণ্ডের সম্পাদক অমর ঘোষ বলেন , গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক চিন্তা , আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন। সভাপতি স্বামী প্রদীপ্তানন্দ মহারাজ ( কার্তিক মহারাজ) ও সংগঠনের কার্যকরী সম্পাদক স্বামী নির্গুণানন্দ দুজনেই রাজ্যের পরিবর্তনে হিন্দু সমাজ যে স্বাধীনতা অর্জন করেছেন সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, হিন্দুত্বের গর্ব বোধ থেকে মহেশতলার মানুষ আসবেন এই অনুষ্ঠানে। তাঁদের চা বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়িত করা হবে। নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হবে গীতা গ্রন্থ।
হিন্দুত্বের প্রতীক গীতা। তাইতো হিন্দুত্ববাদীরা শ্লোগান তোলেন হরে কৃষ্ণ হরে হরে , গীতাপাঠ ঘরে ঘরে। নতুন করে গীতাপাঠ ঘরে ঘরে প্রচার ও প্রসার ঘটাতেই এই হাজার কণ্ঠে বা লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন বাংলার সন্ন্যাস সমাজ। অনভ্যাসের ফল যে কতটা নেতিবাচক হতে পারে, তার বড় প্রমাণ তো শ্রীকৃষ্ণ নিজেই। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে ভগবনের উপদেশ অর্জুনের প্রতি। সেই শ্রী কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর দ্বারকায় ফিরে যেতে উদ্যত , সেই মুহূর্তে অর্জুনের স্বীকারোক্তি হে সখা, যুদ্ধের আগে যে বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে যে বাণী তুমি শুনিয়েছিলে কিছুই মনে নেই। বিড়ম্বনায় কৃষ্ণ বলেছিলেন, তখন যোগবশে বলেছি। আমারও এখন মনে নেই। কিন্তু অর্জুন সখার অনুরোধ তো ফেলা যায় না। স্মৃতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যা বললেন সেখানে গীতার অনেক অংশই উহ্য থেকে গেল। দ্বিতীয়বার যা বলেন সেটি মূল গীতার অনু মাত্র। তাই সেই গীতার নাম অনুগীতা। অর্জুনের স্মৃতিভ্রম, কৃষ্ণের স্মৃতিভ্রম সবই উল্লেখ আছে মহাভারতের অস্বমেধিক পর্বে

যে গীতা কোটি কোটি মানুষের চরম প্রাপ্তি সেই গীতার প্রাচীনত্ব নিয়ে একটা ধোঁয়াশা তো থেকেই যায়। ২০২৬ এ বলা হয় গীতার বয়স ৫১৬৩ বছর। অথচ সর্বজন স্বীকৃত ইতিহাস বলেছে, আর্যদের ভারত আগমন খৃষ্টপূর্ব ৪ হাজার বছরের সামান্য কম বেশি। অর্থাৎ চলতি বছরের হিসেবে ৬ হাজার ২৬ বছর আগে। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব যদি মহাভারতের রচয়িতা হন তাহলে গবেষকরা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময়কাল নির্ধারণ করেছেন ১৪৭৮ খ্রিস্টপূর্বে।
অর্থাৎ ২০২৬ এর হিসেবে যুদ্ধ হয় ৩৫০০ বছর আগেই। সেক্ষেত্রে গীতা রচনাকাল হিসেবে যে দাবি সেই দাবি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাছাড়া গীতা স্বেতাশ্বতর উপনিষদের মার্জিত রূপ নয়ত? সেখানে তো রুদ্ররূপী শিবের বিশ্বরূপ বর্ণিত হয়েছে। দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত ড: সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণ তাঁর রচিত ‘দা ভগবতগীতা’ গ্রন্থে লিখেছেন, গীতা হলো উপনিষদের সার। উপনিষদ গাভী কৃষ্ণ দোহনকারী। আম জনতা যদি ভিড়ের মধ্যে গীতা পাঠ করে আত্মোপলব্ধি অনুভব করেন তবে আশা করি মানব সভ্যতা মানবিক হয়ে উঠবে। কিন্তু প্রশ্ন, একদিন এই গীতাপাঠ অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া এক নতুন হুজুগ হয়ে উঠছে নাতো? জবাব দেবে ভবিষ্যৎ।
