*

দিগদর্শন ওয়েব ডেস্ক: মধুকবি লিখেছিলেন, জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে । চির স্থির কবে নীড়, হায় রে জীবন নদে। তাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী প্রজন্মের উদ্দেশ্যে লেখেন- আজি হতে শতবর্ষ পরে।
বাঁকুড়ার শ্রীধরপুরের গ্রামপ্রধান বঙ্কিম চন্দ্র দে’র ঘরণী হয়ে মাত্র ন বছর বয়সে কমলাবালার পদার্পণ শ্বশুরবাড়িতে। সময়টা ১৯৩৪।১৯২৯ সালের বাল্য বিবাহ নিরোধক আইন ব্রিটিশ সরকার লাগু করলেও গ্রামবাংলায় এই আইন ছিল কাগুজে বাঘ। ১৯৩৪ এ বঙ্গবন্ধু মুজিবর বিয়ে করেন ৮ বছর বয়সী ফজিলা তুন্নেসাকে। একশ বছর আগে ১৮৩৪ সালে বিদ্যাসাগর দিনময়ী দেবীকে বিয়ে করেন। সেই ট্র্যাডিশন একশ বছর পরেও চলে।
বাঁকুড়ার শ্রীধরপুর মল্লরাজাদের সাম্রাজ্যে মল্লভূম নামে পরিচিত। হিন্দু দেবতা বিষ্ণু শ্রীধরের নামেই সম্ভবত গ্রামের নামকরণ। কৃষক পরিবারের সন্তান বঙ্কিমচন্দ্র দে ছিলেন জনদরদী গ্রাম প্রধান। গ্রামোন্নয়ন, সমাজসেবা, মন্দির সংস্কার ইত্যাদি কাজে গ্রামে ছিলেন সকলের প্রিয়।বেশ কিছু বছর আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার। কমলাদেবী একদিকে কৃষক পরিবারের বধূ হিসেবে ঘরের কাজ করতেন । অন্যদিকে ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করতে যাতে অসুবিধা না হয় সেদিকেও দৃষ্টি রাখতেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বড়ছেলে রামানন্দ দে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর।২৩ বছর আগে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের আদর্শে ঘর ছেড়ে সন্ন্যাস নিয়ে আশ্রমে শিশুদের সুনাগরিক গড়ার কাজে নিয়োজিত থাকেন। ছোট ছেলে কৃশানু দে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে একদিকে ব্যবসায়ী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন অন্যদিকে দেবীজ্ঞানে মা কমলাদেবীর প্রতি কর্তব্য পালন করে চলেছেন।

রাখীবন্ধনের দিনে কমলাদেবী শতায়ুর চৌকাঠ অতিক্রম করলেন। খুশি তাঁর সন্তান ও পরবর্তী পাঁচ প্রজন্ম। খুশি ভাত্মীয়স্বজন , পাড়া প্রতিবেশী। শতায়ু জীবনের দিনটি গ্রামে উৎসবের আকার নিল। নিজের পায়ে হেঁটে বাসভবনের লাগোয়া নতুন বাড়ির হলঘরে এসে সকলের সঙ্গে কথা বললেন।
ব্যক্তি জীবনে ২০ বছর কেটেছে তাঁর ব্রিটিশ আমলে। পরবর্তী ৮০ বছর স্বাধীন ভারতে। চলতি বছরেও নিজেই ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস পালন করেছেন ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করেছেন। এই পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁদের শিবজ্ঞানে জীব সেবা। অসুস্থ পথের কুকুর বিড়ালদের যত্ন নেওয়া এই পরিবারের ঈশ্বরের নিত্যসেবার মতোই কাজ।খাদ্যাভ্যাসে তাঁরা বেছে নিয়েছেন ভেগান। অর্থাৎ উদ্ভিজ খাদ্য। এমনকি ভেগান খাদ্যের শর্ত মেনে প্রাণীজ দুধ টুকুও তাঁরা ত্যাগ করেছেন। শতায়ু মায়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও পনির, টোফু দিয়ে বিকল্প মাছ ও মাংসের স্বাদ দিতে পংক্তিভোজন করালেন।
নাতি পুতির ভরা সংসারে কমলাদেবী জানালেন তিনি তাঁর শতবর্ষের জীবনে সুখী। তৃপ্ত। কমলা দেবী যেন বলতে চাইলেন তৃপ্তি আমার , অতৃপ্তি মোর – মুক্তি আমার, বন্ধনডোর, দুঃখ সুখের চরম আমার জীবন মরণ হে, চিরপথের সঙ্গী আমার চিরজীবন হে।
