শিরোনাম

বেশ্যার বারমাস্যা

পর্ব :১৯৯

রসিক বাজায় ঢোল, নাচনি গলায় বোল।

সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়: এই পর্বে নাচনি প্রথা সম্পর্কে জানাই। পশ্চিমবঙ্গেরপুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর জঙ্গলমহল ও ঝাড়খণ্ডের মানভূম অঞ্চলের ঝুমুর নৃত্যশিল্পীদের একটি গোষ্ঠী নাচনি সম্প্রদায়। ষোড়শ শতাব্দীতে জমিদার ভূস্বামীদের মনোরঞ্জনের জন্য বৈষ্ণবীয় প্রভাবে রাধাকৃষ্ণের লীলা অবলম্বনে এই নাচ শুরু। রাধার ভূমিকায় গরীব ঘরের মেয়েরা পেটের টানে সর্বসমক্ষে নাচত। অভিভাবক হতো গান বাঁধিয়েরা ও ঢোলকবাদক। তাঁরাই অলিখিত স্বামী। নাম রসিক। এই সম্প্রদায়ের নারী পুরুষ উভয়েই সমাজের নিচের তলার। যেমন কুমোর, তাঁতি, বাগদি, ভূমিজ, কুরমি, সাঁওতাল। নাচ মুলত শৃঙ্গার ও আদি রসাত্মক।

নটী বিনোদিনীও ছিলেন রক্ষিতা।

সংস্কৃত নৃত্য থেকে প্রাকৃত নচ্চ থেকে নাচ। নাচনি নারী দেবদাসী প্রথার নাচিয়ে। কিছুটা প্রথা গত পার্থক্য থাকলেও নাচনিদের জমিদার ও পুরোহিত পান্ডাদের মনোরঞ্জনের জন্য শয্যা সঙ্গিনীও হতে হতো। সেযুগের বসন্তসেনা বা উত্তরকালে নটী বিনোদিনী বা এযুগের ক্যাবারে শিল্পী একইভাবে যৌনশোষিত।

দর্শকদের মধ্যে নাচনি।

প্রথম যুগে নাচনিরা পড়তেন ঘাঘরা। এখন শাড়ি পড়েন।চুলের গন্ধ তেল, রঙিন ফিতে, সেখানে গোঁজা রুপোর ঝুমকো কাঁটা, চোখে কাজল, কাঁচপোকা টিপ, সস্তার লিপস্টিক, পাউডার। অঙ্গে ঝুটি সোনার কানপাশা , বাজু, চুড়ি, চওড়া কোমরবন্ধ, হার। লাল শাড়ি, চকমকি জরির ব্লাউজ। সংস্কৃতির চেয়ে এখন দর্শকের লোলুপ দৃষ্টি নাচনির শরীরে ভ্রমণ করে বেড়ায়। এই নাচনিদের রসিক বা নাগর শুধু যে নিম্নবর্গের তা নয়। অনেক উচ্চবর্ণের পুরুষ রক্ষিতা করে রাখতেন নাচনিদের। আজও গোপনে রেখে ঢেকে সেই ট্র্যাডিশন আছে। তবে এই ঘৃণ্য প্রথার যে মূল সংস্কৃতি রাধাকৃষ্ণের প্রেম বিষয়ক নাচঅস্তিত্ব বজায় রেখেছে এই রসিকদের জন্যই ।

ঝুমুর নাচের বিবর্তনে নাচনি সংস্কৃতি।

ডসরকারিভাবে নাচনিদের পুরষ্কৃত করা হয় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এমনই এক পুরষ্কার প্রাপ্তা নাচনি পোস্তবালাদেবী। সুকান্ত সরকারের কাছে দেওয়াএক সাক্ষাৎকারে পোস্তবালাদেবী জানান , ছেলেবেলায় বাবা মারা যান। মা বিমলামুদিও ছিলেন নাচনি। তাঁর যখন বয়স পাঁচ বছর ,মা একজনের সঙ্গে গ্রামছেড়ে চলে যায়। ওই বয়সেই ভিক্ষা করে পেট চালাতে হয় পোস্তবালাদেবীকে। পেটের জ্বালায় ভুট্টার ক্ষেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান একদিন। পড়শি মাকে খবর দিলে মা সঙ্গে নিয়ে যান। মায়ের সঙ্গে মাঠে কাজ করতে হত।১২ বছর বয়সে এক দাদুর বয়সী বৃদ্ধের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হয় মা। বুড়োর ছিল বউ ছেলেমেয়ে।( চলবে)

পরবর্তী পর্ব আগামী ২০ মার্চ, শুক্রবার,২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *