শিরোনাম

যোগ দিবসে যোগ দিয়ে সুস্থ শরীর অসুস্থ করছেন না তো? প্রাণায়াম কি বিজ্ঞানসম্মত?

শ্রীজিৎ চট্টরাজ:

যোগ ব্যায়াম রত প্রধানম্ত্রী।

২১ জুন। আর্ন্তজাতিক যোগাদিবস উপলক্ষে ভারত জুড়ে শুরু হয়েছে যোগা চর্চা। মূল অনুষ্ঠান রবিবার । সংবাদ সূত্রের খবর, ২১ জুন পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে প্রায় দু কোটি মানুষ সংঘবদ্ধভাবে যোগাসন করবেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্বীকৃতিতে দিনটি বিশ্ব যোগা দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০১৪ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২১ জুন তারিখটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাক এমন অনুরোধ করেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি অশোক মুখোপাধ্যায় ২০১৪ সালে ১১ ডিসেম্বর সাধারণ সভায় ১২৪ নম্বর আলোচ্য বিষয়ের ওপর এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন।১৭৫ টি দেশের সম্মতিতে প্রস্তাবটি পাশ হয়।

২১ জুন দিনটি বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ দিনটি বছরের দীর্ঘতম দিন। অবশ্য প্রতি বছর যে এই দীর্ঘতম দিনটি ২১ জুন হয়, এমন নয়। কখনও ২০ বা কখনও ২২ জুন হতে দেখা গেছে। অর্থাৎ এইদিনে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে ছ’ঘণ্টা বেশি সময় নেয়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে গ্রীষ্মকালীন অয়নকাল বলা হয়েছে। হিন্দু ধর্মে এই দিন দক্ষিণায়ন হিসেবে মান্যতা দিয়ে বলা হয়েছে, আধ্যাত্বিক সাধনা ও সিদ্ধিলাভের জন্য শুভদিন। হিন্দু শাস্ত্রে এও বলা হয়েছে, এইদিনে শিব মানবজাতিকে যোগ জ্ঞান প্রদান করেন। আবার এইদিনে যেহেতু সূর্য বেশি সময় কিরণ দেয় ফলে দিনটি সূর্য পুজোর উপযুক্ত দিন হিসেবে গণ্য হয়। এ শুধু হিন্দুত্বের বিধান নয়, প্রাচীন ইরানে অর্থাৎ পারস্যে একইভাবে সূর্য পুজোর মধ্যে যোগ সাধনা হতো।

এবার বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার। তাই কলকাতায় আসেন প্রধানমন্ত্রী। যে রেড রোডে মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, রাস্তা আটকে নাগরিক সমস্যা সৃষ্টির অভিযোগে সেই রেড রোড সাতদিন বন্ধ করে যোগাভ্যাস চলেছে। বিষয়টি সম্পর্কে সাংবাদিকেরা রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং তাঁর নিরাপত্তার কারণে রাস্তা বন্ধ রাখা হবে এর মধ্যে অস্বাভাবিকতা কি আছে? সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে এও বলেছেন,১০৭ বছর ধরে ঘটে চলা ঘটনা আটকে দেওয়ায় যাঁদের দম বন্ধ হচ্ছে তাঁরা বাংলাদেশ বা পাকিস্থান চলে যান। এই বক্তব্যে তিনি কাদের ইঙ্গিত করলেন বুঝতে অসুবিধে হয় না।

মুশকিল হলো এই যোগা দিবসের হুজুগে এমন একটা ব্যাপার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে যেন শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য হিন্দু ঐতিহ্যের এই যোগাদিবস এক মহান ব্যাপার। বিষয়টা আধ্যাত্বিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণে খতিয়ে দেখা যাক। বলা হয়, ঋগ্বেদে প্রথম যোগাভ্যাসের উল্লেখ মেলে। এবার দেখা যাক ঋগ্বেদের সময়কাল কি বলা হয়েছে? গবেষকরা বলেন, ঋগ্বেদের রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১০০০ অব্দের মধ্যে। অনেকে আবার সময়কালকে আরও পুরানো দাবি করেছেন। ঋগ্বেদের সময়কালে সামাজিক জীবনে যোগভ্যাসের নির্দিষ্ট তথ্য মেলে।

এবার প্রাচীন পারস্যে এখনকার ইরানের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ জেন্দ আবেস্তা। যা ইরানের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ । সেখানে সেই খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দে এই ধর্মগ্রন্থ রচিত বলা হয়েছে। ঋগ্বেদের মত সেই গ্রন্থও কয়েকl শতাব্দী মৌখিক ঐতিহ্যের মধ্যেই সংরক্ষিত হয়েছে। এটাও সত্যি, প্রাচীন এই পারস্যের গ্রন্থের সঙ্গে বৈদিক সাহিত্যের ঋগ্বেদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক মিল আছে। সুতরাং কে কাকের অনুসরণ করেছেন গবেষণার বিষয়।

ইরানীয় এই ধর্মগ্রন্থের একক স্রষ্টা জরাথ্রুস্ট। এই ধর্মের স্রষ্টা সূর্যকেই ঈশ্বর হিসেবে মান্যতা দিয়েছেন। যার ফলে এই ২১ জুন তারিখে পার্সি নববর্ষ পালিত হতো। সাম্প্রতিক কালে ইরানে মুসলিম ধর্মের প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত। এই উৎসব পালিত হওয়ার অন্যতম কারণ ২১ জুন উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালীন বিষুব ।

২১ জুন। বছরের বৃহত্তম দিন।

জেন্দ আবেস্তায় দম নামে একটি শব্দ আছে যার অর্থ আধ্যাত্বিক শ্বাস। ভারতীয় যোগশাস্ত্রে যাকে প্রাণায়াম বলা হয়। প্রাচীন পারসিক ধর্মেও বিশ্বাস ছিল নির্দিষ্ট নিয়মে শ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘ করার মাধ্যমে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পায় ও আত্মিক উন্নতি হয়। বৈদিক সাহিত্যের অন্যতম উপাদান ঋগ্বেদ। এই বেদকে প্রাচীন সনাতন বলা গেলেও হিন্দু ধর্মের আদি বলা সত্যের অপলাপ। বেদে মূর্তিপূজা নিম্নস্তরের সাধনা বলা হয়েছে। বেদের সূত্র নিরূপণ করে রামমোহন লিখেছেন ,তীর্থস্থানে তপস্যা, প্রতিমাতে দেবজ্ঞান করে যাঁরা তাঁরা বড় গরু অর্থাৎ অতি মূঢ়। ( রামমোহন রায় ও মূর্তিপূজা, অমরচন্দ্র ভট্টাচার্য , প্রকাশক সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ,২০০১, পৃষ্ঠা ৮৬)

ফিরে যাওয়া যাক যোগা প্রসঙ্গে। সিন্ধু সভ্যতার ফসল যোগা। পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে বুদ্ধদেব ও মহাবীর মনসংযোগের মাধ্যম হিসেবে যোগ চর্চার বিধান দেন। এসব খ্রীষ্ট পূর্ব ৬৫০ সময়কালের কথা। হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করেন, ঋষি পতঞ্জলি যিনি অর্ধেক মানব অর্ধেক সর্প। তিনিই যোগদর্শনের আদি গ্রন্থ রচনা করেন । আধুনিক যুগে ১৯ শতকের শেষে স্বামী বিবেকানন্দ পশ্চিমী দেশে যোগব্যায়ামকে জনপ্রিয় করেন।

বেশ কয়েকবছর আগে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে এক প্রতিবেদনে দ্য জার্নাল অব বডিওয়ার্ক এ্যান্ড মুভমেন্ট থেরাপিস নামে একটি গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছে। সিডনি বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইভ্যাংলস পাল্লাস এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , প্রতি দশ জন যোগাভ্যাসকারীর একজনের পেশীর ব্যথায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যাদের আগেই ব্যথায় আক্রান্ত তাদের জন্য যোগাসন মারাত্বক ক্ষতিকর। নিউইয়র্কের দুটি যোগা স্টুডিওতে নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন এমন ৩৫০ জনকে নিয়ে গবেষণা হয়। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ লিগামেন্ট,পেশীর ও স্নায়ুর সমস্যা দূর করতে যোগব্যায়াম করেন। ইংরেজিতে জাকের বলে মাসকুলোস্কেলেটা ডিসঅর্ডার। কিন্তু বিজ্ঞানী ইভাংল পাপ্পাস বলেছেন, যোগ ব্যায়াম এই ব্যথার উপশমে তৎক্ষণাৎ ফল মিললেও স্থায়ী সমাধানের নয়। বরং ভবিষ্যতের জন্য মারাত্বক।

গবেষক দলের অন্যতম সদস্য নিউইয়র্কের বি মার্সি কলেজের অধ্যাপক মার্ক ক্যাম্পো বলেছেন, যোগ ব্যায়ামের কিছু ইতিবাচক দিক আছে বটে, যার মধ্যে পেশী সঞ্চালনের ক্ষেত্রে কিছু সুফল মেলে। যোগ ব্যায়ামের অন্যতম ব্যায়াম শ্বাস প্রশ্বাসের অনুলোম- বিলোম। এযুগের এক বাবাজি রামদেববাবা। তিনি প্রাণায়াম প্রসঙ্গে হাবৃত্তি , অভ্যন্তর বৃত্তি, স্তম্ভ বৃত্তি ও বাহ্যভান্তর বৃত্তির কথা বলেছেন। কিন্তু নিঃশ্বাসে ও প্রশ্বাসের এই বিধি কতটা বিজ্ঞানসম্মত?

পারস্যের বর্তমান ইরানের ধর্মগ্রন্থে সূর্যের আরাধনায় যোগ সাধনার কথা আছে।

মানবদেহের গঠনতন্ত্র বলে নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রশ্বাসে যায় শ্বাসনালী বা ল্যারিংস- এ । শ্বাসনালী দিয়ে সেই বাতাসের অক্সিজেন যায় ফুসফুসে। ফুসফুস থেকে শ্বাসনালী হয়ে নিঃশ্বাস নাকের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে। সুতরাং নাকের ছিদ্র আঙুল দিয়ে চেপে বন্ধ করে নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা মূর্খতা। কারণ দুটি নাকের ছিদ্রই শেষপর্যন্ত একটি শ্বাসনালীতে গিয়ে মেশে। প্রাচীন যুগে মানবদেহের নিখুঁত তত্ত্ব জানা না থাকায় এক উদ্ভট ধারণা ছিল। ধর্মের নামে ঐতিহ্যর বিজয়ের রাখতে আজও এই অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রচার করা হচ্ছে।

অনেক বাবাজি এই যোগাভ্যাস কঠিন রোগের নির্মূল করে বলে অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রচার করে চলেছেন যা রীতিমত অন্যায়। যোগাসন বা যোগ ব্যায়াম এক নয়। মানসিক স্থিতি আনতে যোগাভ্যাস কাজ করে বটে , কিন্তু কোন রোগ সারায় না। যোগব্যায়ামের অন্যতম কপালভাতি।

প্রচারে যা প্রসার ঘটেছে সেটা কিন্তু যাদের হার্নিয়া, গ্যাস্ট্রিক আলসার বা হাইপারটেনশন বা মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা আছে তাদের জন্য মারাত্মক। উপযুক্ত কুশলীর তত্ত্বাবধানে ছাড়া যোগব্যায়াম উপকারের চেয়ে ক্ষতি করে বেশি। রক্তসঞ্চালনে সমস্যা সৃষ্টি হয়ে স্ট্রোক হয়ে মৃত্যুও হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হাজারে হাজারে মানুষ যোগব্যায়াম করতে গেলে কার্ডিও ভাস্কুলার হার্ট বলিয়াম ( লেফট ও রাইট ভেন্ট্রিকল) বাড়িয়ে হৃদয় প্রাচীরের ঘনত্ব বাড়ায় ফলে মায়োকার্ডিয়াল কোষের ক্ষতি করে।

ভারতে যোগ প্রচলন করার প্রথম দাবিদার বুদ্ধদেব ও মহাবীর

যোগ কাকে বলে তাই নিয়েও রয়েছে নানা মুনির নানা মত। ঋষি পতঞ্জলির ভাষ্যে আছে,যোগ কথার অর্থ সহজাত প্রবৃত্তির নিরোধ মহর্ষি ব্যাস বলেছেন , যোগ মানে সমাধি। ধ্যান। তান্ত্রিকরা বলেন, কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত করে আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন যোগ। এখনকার যোগগুরুরা যোগ ও যোগ ব্যায়ামক মিশিয়ে এক বিভ্রান্তি তৈরি করে চলেছেন। খেচড়ি মুদ্রা জানা থাকলে নাকি ক্ষুধা তৃষ্ণা দূর হয় তাহলে খাদ্যাভাবে দেশে কেনএত মানুষ্ট অভুক্ত হয়ে অপুষ্টিতে ভোগেন?

সুতরাং হুজুগে মেতে বসে শুয়ে নেচেকুঁদে পদ্মাসন, বজ্রাসন, সর্বাঙ্গাসন মৎসেন্দ্রাসন থেকে সূর্য নমস্কার করে যোগদিবস পালন করলেন , জানলেন না আপনার কোনো অজানা ব্যাধি আছে কি না। ফলে হিতের বিপরীত হলো কি না কে বলবে?

কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত করার যে তত্ত্ব প্রচার করা হয় সেই সম্পর্কে যুক্তিবাদী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ প্রয়াত প্রবীর ঘোষ তাঁর অলৌকিক নয় লৌকিক গ্রন্থের পঞ্চম খন্ডের ১৮৫ নম্বির পৃষ্ঠায় লিখেছেন, যোগদর্শনটাই দাঁড়িয়ে আছে মানবদেহের সম্পূর্ণ ভুল গঠনতন্ত্র বা অ্যানাটামি জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে । সুতরাং যোগাভ্যাস করে কূল কুণ্ডলিনী জাগ্রত করা অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *