পর্ব:৩
চিকাগো সম্মেলনে আমন্ত্রিতদের সঙ্গে বিবেকানন্দ।
সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়: দ্বিতীয় পর্বে জানিয়েছি , রাজস্থানের খেতরির মহারাজা অজিত সিং আমেরিকায় যাতায়াতের খরচ বাদে বিবেকানন্দের চাহিদামত তিনহাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকায় পৌঁছে বিবেকানন্দ সেই টাকা হারিয়ে ফেলেন। জনৈক মন্মথনাথ ভট্টাচার্য মারফত খবর পেয়ে আবার বোম্বাইয়ের টমাস কুক অ্যান্ড সন্স ট্রাভেল এজেন্সি মারফত পাঁচশ টাকা পাঠান এবংএও জানান প্রয়োজনে আরও কিছু টাকা তিনি পাঠাবেন। এমন তথ্যই দিয়েছেন নিরঞ্জন ধর তাঁর অন্যচোখে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৪৪ পৃষ্ঠায়।
নিরঞ্জন ধর আরও লেখেন,,,,,,, মহিশূরের মহারাজা ও রামনাদের মহারাজের কাছ থেকেও স্বামীজী কিছু অর্থ সাহায্য পেয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে একথা বললে নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না যে, বিবেকানন্দ মুখ্যত সামন্ততান্ত্রিক ভারতবর্ষের দূত হয়ে চিকাগো ধর্মমহাসভায় যোগ দিয়েছিলেন।,,,,,, পরবর্তীকালে স্বামীজী নিজে মহারাজা অজিত সিং – এর কাছে তাঁর অপরিশধ্য ঋণের কথা স্বীকার করেছেন।১৮৯৯ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি মহারাজকে লিখেছেন: আমার কথা বলতে গিয়ে আমি বেশি আর কী বলব? এই বিশ্বে আমি যতটুকু যা হতে পেরেছি তার প্রায় সবটাই আপনার জন্য সম্ভব হয়েছে। আপনি এক ভয়ানক দুশ্চিন্তার হাত থেকে আমাকে রক্ষা করেছিলেন এবং আপনার জন্য বিশ্বের সম্মুখীন হয়ে কিছ কাজ করতে আমি সক্ষম হয়েছিলাম ।( পৃষ্ঠা ৪৪/৪৫)
মহারাজা অজিত সিং এবং বিবেকানন্দ
সেই একই গ্রন্থে বিষয়টি নিয়ে লেখক আরও বিস্তারিত তথ্য দিয়ে লেখেন,,,,,,,,,, এখানে লক্ষ্য করতে হবে যে, বিবেকানন্দের বিদেশযাত্রা শেষপর্যন্ত আদৌ মাদ্রাজের সংগৃহীত অর্থের উপর নির্ভরশীল ছিল না। এই যাত্রার সমস্ত ব্যবস্থা আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। সেক্ষেত্রে মাদ্রাজ থেকে আগতটাকা তাঁর poket money – র কাজ করেছিল। কিন্তএই টাকারও সিংহভাগ সংগৃহীত হয়েছিল মাদ্রাজও ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশীয় রাজ্যের নৃপতিদের কাছ থেকে। সেক্ষেত্রেও বিবেকানন্দের বিদেশযাত্রাকে সামন্ততান্ত্রিক ভারতের দূত বলে অভিহিত করা খুব অসঙ্গত হবে? বিবেকানন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত-র মন্তব্য এই প্রসঙ্গে লক্ষণীয়। সমস্ত দিক বিচার করে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে,some liberal ruling princes and the liberal bourgeoisie of Madras arranged for the departure of Swamiji to the West. তাঁরা বিবেকানন্দকে হিন্দুধর্মের প্রতিভূ করে পাশ্চাত্য দেশে পাঠাতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন কারণ ‘ that was the sounding -board for Indian ears.’ মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই অজিত সিংয়ের একটু পরিচয় দেওয়া যাক।
আমরা এও জানি, শুধু মহারাজা অজিত সিং ছাড়াও বেশ কিছু হিন্দু স্বাধীন রাজা অর্থাৎ যে রাজ্যগুলি ব্রিটিশ সরাসরি শাসন করত না, কিন্তু কর নিত , তেমন করদ রাজ্যের অন্যতম ছিল রাজস্থানের খেতরি । বিবেকানন্দ অনুগামীরা বলেন, বিবেকানন্দ আসলে চেয়েছিলেন এইসব করদ রাজ্যের রাজাদের ঐক্যবদ্ধ করে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করানো। এই প্রসঙ্গে নিরঞ্জন ধর তাঁর গ্রন্থে ( অন্য চোখে বিবেকানন্দ) রাজ আতিথ্য শিরোনামে নিবন্ধে লিখেছেন,,,, বিবেকানন্দের দীর্ঘ ভারত- পরিক্রমাকালে প্রায় সর্বদাই দেশীয় রাজ্যের রাজা -মহারাজাদের আতিথ্য গ্রহণে ঐুৎসুক্য দেখিয়েছেন। তিনি রাজপ্রাসাদে বাস করতেন, রাজাদের সঙ্গে খানাপিনা করতেন। রাজাগজাদের স্বামীজীর এই অন্তরঙ্গতা স্বামীজীর জীবিতকালেই তাঁর গৃহী গুরুভাইদের মনে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল এবং তারা গরীব রামকৃষ্ণ সভা নামে বেলুড় মঠের এক প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা গড়ে তুলতে অগ্রসর হয়েছিলেন। আমরাও বিবেকানন্দের এই আচরণকে সন্ন্যাসীজনোচিত ও গৃহীসুলভ আচরণ বলে মনে করছি। ( পৃষ্ঠা ১১১)
বিবেকানন্দের ভাই কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত দেশীয় রাজারা যাঁরা বিবেকানন্দকে অর্থ সাহায্য করতেন তাঁদের আখ্যায়িত করেছেন উদার বুর্জোয়া হিসেবে।
নিরঞ্জন ধরের এই নিবন্ধের বিরোধিতা করে বিবেকানন্দ অনুরাগীদের কেউ কেউ রাজাদের আতিথ্যগ্রহণ সম্পর্কে বলেছেন ভারত পরিক্রমায় বেরিয়ে স্বামীজী দু – এক জায়গায় রাজ – আতিথ্য নিতে বাধ্য হলেও অন্য সব জায়গাতেই তিনি বৃক্ষতলবাসী ছিলেন আর তার এই বৃক্ষতলবাসের বর্ণনা আমরা পাই পাতার পর পাতা গম্ভীরানন্দের ‘যুগনায়ক বিবেকানন্দ ‘ ও মহেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিকথা থেকে। মহেন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায় কিন্তু স্বামীজীর ‘অশেষ ক্লেশকর ‘ পরিব্রাজক জীবনের কোন বিশেষ উল্লেখ পাই না ।( পৃষ্ঠা ১১/১১২)( চলবে)
পরবর্তী পর্ব আগামীকাল ১৫ সেপ্টেম্বর , রবিবার,২০২৪