পর্ব:১৯২

মনু সংহিতায় নারীর নিন্দা ছত্রে ছত্রে।
সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়: প্রাচীন যুগের বারবনিতাদের সামাজিক অবস্থান বুঝতে সেযুগের সামাজিক প্রেক্ষাপট জানাটা জরুরি। এই ব্যাপারে সাহায্য নিচ্ছি কঙ্কর সিংহের ধর্ম ও নারী গ্রন্থের প্রাচীন সাহিত্যে নারী- নিন্দা অধ্যায় থেকে। লেখক ৫৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে নারী -নিন্দায় ভরপুর। যতই স্মৃতিশাস্ত্রে নারীকে মহাভাগা পূজার্হ্য গৃহদীপ্তয় বলে বর্ণনা করুক তার পূর্বেই এই প্রশস্তিতে যুক্ত করা হয়েছে প্রজানার্থং শব্দটি।( মনু সংহিতা ৯/২৬)
নারী ততদিন পর্যন্ত গৃহলক্ষ্মীরূপে বিরাজ করবে যতদিন পুরুষের জন্য পুত্র সন্তানের যোগান দিতে পারবে। বৈদিক ধর্ম প্রাচীন ভারতেই পুরুষসূক্তের পর নারীকেও শূদ্রের পর্যায়ের অবনমিত করে। শূদ্রের জন্ম হয়েছিল সেই বিরাট পুরুষের চরণ থেকে , কিন্তু নারীর জন্ম তো আলাদাভাবে হয়নি সেই চরণ থেকে। তাহলে বেদ এবং বেদ পরবর্তী প্রাচীন সাহিত্যর নারীকে অপবিত্র শূদ্রের পর্যায়ে নামিয়ে দিল কেন?

সুকুমারী ভট্টাচার্য তথ্যপ্রমাণ দিয়ে লিখেছেন নারী নিন্দার কথা।
লেখক লিখছেন, সুকুমারী ভট্টাচার্য মনে করেন, নারী সর্বোতভাবে পুরুষের অধীন।সমাজের নিচুতলার অধিবাসী দুজন; নারী ও শূদ্র। বহু শাস্ত্রাংশে এ দুজনের নাম একই নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়েছে; সমাজের প্রয়োজন দুজনকেই; কিন্তু দুজনেই অশুভ, কালো, অমঙ্গল এমন কথা বারেবারেই বলা হয়েছে। নারী মিথ্যা, (পুরুষের পক্ষে) দুর্নিমিত্ত, সে মদ ও জুয়োর মতো একটি ব্যসন মাত্র। নারী রাত্রে পুরুষকে মোহিত করে নিজের ইষ্টসিদ্ধ করে নেয়। আরো শুনি ( পুরুষের) উচিত নয় মিথ্যা অর্থাৎ নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করত, বা কুকুর, কালো পাখির প্রতিও , যাতে অন্ধকার ও আলো, সত্য ও অসত্য মিশে না যায়। নারীর স্থান এতটাই নিচে যে বলা হয়েছে সর্বগুণান্বিত শ্রেষ্ঠ নারীও নির্গুণ পুরুষের চেয়ে অধম। তাই একদিনের্ট উপবাস হল প্রায়শ্চিত্ত, কালো পাখি, শকুনি বেজি, ইঁদুর, কুকুর, শূদ্র ও নারীকে বধ করার পাপ থেকে পরিত্রাণের বিধান। এ শাস্ত্রাংশই বোধহয়, সবচেয়ে স্পষ্ট করে নারীকে বধ করার পাপ থেকে পরিত্রাণেরবিধান।

সতী স্ত্রী শব্দবাচক।এই শব্দের পুরুষবাচক শব্দ নেই।
সুকুমারী ভট্টাচার্য লিখেছেন , এই শাস্ত্রাংশই বোধহয়, সবচেয়ে স্পষ্ট করে নারীকে ঊনমানবতাকে উচ্চারণ করেছে; তালিকায় নারী ও শূদ্রের ছাড়া বাকিগুলি পশুপাখি এবং সবকটিই অশুভ ও দুর্নিমিত্ত। বিপথগামী অর্থাৎ পরপুরুষে আসক্ত নারীর শাস্তি যেমন নিষ্ঠুর তেমনই জুগুপ্সাবহ। সমাজে সে অপাঙক্তেয় বরাবরই, কোনো সভাসমিতিতে যাওয়া তার ঋগ্বেদের আমল থেকেই নিষিদ্ধ ছিল। নারীর বিপথগামিতার শাস্তি চূড়ান্ত, এমন নিষ্ঠুর ভি শাস্তির পরেও বাড়ির মধ্যেই তাকে একঘরে করে রাখার ব্যবস্থা ছিল। অথচ পরনারীতে আসক্ত পুরুষের শাস্তি যে দু -একটি জায়গায় বিধান দেওয়া হয়েছে সেখানেও সেটা একবেলার্ট উপবাসমাত্র। একবার বলত আছে , গাধার চামড়ায় গা ঢেকে সে দুয়ারে দুয়ারে নিজের অপকর্ম ঘোষণা করবে। অথচ সমগ্র সংস্কৃতির সাহিত্যে কোথাও ভ্রষ্ট পুরুষের বি এ শাস্তি গ্রহণের কথা শোনার যায় না, যদিও ব্যভিচারিণীর শাস্তির কথা বারেবারে শোনা যায়। দাম্পত্যে পরস্পরের। প্রতি বিশ্বস্ত থাকার কোনো ধারণাই ছিল না শাস্ত্রে বাত সমাজে, তাই সতী শব্দের ঐ অর্থে কোনো পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ নেই, অথচ সন্দেহমাত্রেই সত্য হোক, মিথ্যা হোক, তেমন কোনো অপরাধে নারীকে কলঙ্কিত , দণ্ডিত ও মানবিক অধিকারে বঞ্চিত করা হত।( সুকুমারী ভট্টাচার্য , গ্রন্থ: মন্থন, পৃষ্ঠা ৯৮-৯৯)।( চলবে)
আগামী পর্ব ২৩ ফেব্রুয়ারি, সোমবার,২০২৬

